শুক্রবার , ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯
সর্বশেষ সংবাদ
Home » মুক্ত কলাম » মওলানা ভাসানী ও কিছু কথা
maxresdefault

মওলানা ভাসানী ও কিছু কথা

12274374_118855405147239_4793090080853021231_nএম, এ, আজিজ ঃ 
“বল বীর বল উন্নত মম শির
শির নেহারী আমারি নতশির
ঐ শিখর হিমাদ্রীর” বল বীর !!
“একজন দেহাতি(গেয়ো মানুষ)রাষ্ট্রনায়ক”
 
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বন্চিত মওলানা ভাসানী ছিলেন একজন গেয়ো(গ্রাম্য) খাঁটি মুসলমান ও খাঁটি মানুষ । তার সম্প্রদায় ছিল গ্রামের কৃষক, শিল্পকারখানার শ্রমিক, নির্যাতীত নিপীড়িত অধিকার বন্চিত মজলুম জনতা । হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান নির্বিশেষে তিনি ছিলেন তাদের মানুষ ও ভরসাস্থল । নাস্তিক, আস্তিক নির্বিশেষে সকলেই এই মহান অসাম্প্রদায়ীক মানুষের সাহ্নিধ্যে এসে আশ্রয় নিতেন, মুগ্ধ ও প্রভাবিত হতেন । বাস্তব জীবনে বিভিন্ন ধরনের শারিরীক কার্য্যের অভিজ্ঞতা ছিল তার । জীবন সংগ্রামে কখনো তিনি হয়েছেন মুটে, কখনো কামলা, কখনো বাসার কাজের লোক, কখনো বাবুর্চি । কখনো পালা গানে অংশ নিয়েছেন । কখনো যাত্রাগানে অভিনয় করেছেন । আবার কখনো হয়েছেন মক্তবের মোল্লা । কোন প্রকার পরিশ্রমের প্রতি তার অনিহা ছিল না। তিনি নিজেই ছিলেন মজলুম এবং শ্রমজীবীর কাজ করার ফলেই হয়তো তিনি কৃষক-শ্রমিকের ব্যাথা-বেদনার চিরসাথী হতে পেরেছিলেন । তার রাজনীতি ছিল কৃষক- শ্রমিক মেহনতী মজলুম জনতার সমর্থন পুষ্ঠ । জীবনের বাস্তব অবিজ্ঞতার আলোকে পর্য্যায়ক্রমে কৃষক-শ্রমিক ও নির্য্যাতীত গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য জোতদার, মহাজন, জমিদার, অত্যাচারী স্বৈরাচার শাসক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন কৃষক শ্রমিক মজলুম জনতার নেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।
ভারত বিভাগের পরে তিনি গড়ে তোলেছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ মতান্তরে আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি । ৫৪ সালের নির্বাচনে মওলানার নেতৃত্বে গড়ে উঠা যুক্তফ্রন্ট সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে । পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠি ছল-চাতুরী করে ও কমিউনিস্ট বিশৃঙ্খলা দমনে ব্যার্থতার অভিযোগ এনে শেরে বাংলার মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করে দেয় ।
মওলানা বেড়িয়ে পরেন সুইডেনের রাজধানী ষ্ট্রকহোমে বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগদান করতে । সেখান থেকে বৃটেনে আসেন । তার আগমনের খবর পেয়ে বিশ্ব বরৈন্য রাজনীতিবীদ, দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিক , সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবিগণ মওলানার কাছে ছুটে আসেন । বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এ্যাটলী, নোবেল বিজয়ী দার্শনিক লর্ড বাট্রান্ড রাসেল, নিউ ষ্টেটসম্যান এন্ড নেশন পত্রিকার প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবি সম্পাদক কিংসলে মির্টিন, কালজয়ী সোভিয়েত উপন্যাসিক ইলিয়া ইরেনবুর্গ, তুরস্কের দার্শনিক কবি নাজিম হুরমত, চিলির বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদা, রয়টারের সাংবাদিকবৃন্দ সহ অনেকেই মওলানার সাথে সাক্ষাত করেন । তিনি তাদের কাছে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দর মীর্জা কতৃর্ক নির্বাচিত সরকারকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করার জন্য লন্ডনে প্রতিবাদ করেন এবং বাঙ্গালীর সাথে পশ্চিম পাকিস্তানীদের অত্যাচার নির্যাতন অধিকার বঞ্চনার কথা এবং সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও সাম্প্রসারনবাদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন। পরের দিন “রেড মওলানা অফ দি ইষ্ট” শিরোনাম দিয়ে ইংল্যান্ডের সকল সংবাদপত্রে খবর প্রচার করা হয়। কোন কোন পত্রিকায়- “Compulsive religious preacher become impulsive socialist.”নামেও মওলানার সম্পর্কে লেখা হয় । প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দর মীর্জা মওলানা ভাসানী দেশে ফিরে এলে দেখামত্র গুলি করার ঘোষনা দেন । লন্ডনে তিনি দীর্ঘদিন নির্বাসিত ছিলেন ।
পরবর্তিকালে ১৯৫৭ সালে পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের নির্য্যাতীত, নিপীড়িত অধিকার বন্চিত বাঙ্গালীর দাবীর প্রতি সমর্থন আদায় করার লক্ষ্যে মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানে সফরে যান । করাচি মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে মেয়র হাফিজ হাবীবউল্লাহ মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সম্মানে এক নাগরিক সম্বর্ধনা প্রদান করেছিলেন । করাচী মেট্রোপলিটান হোটেলে অনুষ্ঠিত সম্বর্ধনা সভায় পশ্চিম পাকিস্তানের বড বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ, উর্দূ সাহিত্যের বিখ্যাত কবি ও লেখকবৃন্দ সহ পাঁচ শতাধিক বিশিষ্ট নাগরিক উপস্হিত হয়েছিলেন ।
অতিথির সম্মানে মেয়র হাবীবউল্লাহ মানপত্রের জবাবে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য মওলানা ভাসানী মন্চে গিয়ে দাঁড়ালেন । তার পরনে ছিল চিরাচরিত আধ-ময়লা সাদা পান্জাবী, সাদা তবন( লুঙ্গী ) মাথায় তেলশিটে তালের টুপি, মুখে সফেদ দাড়ি, পায়ে রঙচটা চটি জুতা । মওলানা সাহেব মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াতেই তার সুরত দেখে এক টেবিলে বসা পাঁচজন অতিথির একজন বেশ জোরে বলে উঠেন ইয়েতো দেহাতি হ্যায় অর্থাৎ এ তো একজন গেয়ো মানুষ । মওলানা সাহেব তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে পবিত্র কোরআন শরীফের আয়াত তেলওয়াত পড়া শুরু করার সাথে সাথে ঐ একই টেবিলের আরেকজন ব্যুরোক্রেট মন্তব্য করলেন ইয়েতো মোল্লা হ্যায় । মওলানা সাহেব বক্তৃতা করে চলেছেন পাকিস্তানের সামন্তবাদী ও লুটেরা পুঁজির শোষনের কথা । মেহনতী মানুষের দুঃখের কথা, শ্রমিক কৃষকের অধিকারের কথা । এমন সময় আরেক টেবিল থেকে অন্য একজন উচ্চস্বরে মন্তব্য করলেন " সাচই শোনা থা ইয়ে তো কম্যুউনিষ্ট হ্যায় অর্থাৎ সত্যিই তো শুনেছিলাম উনিতো কম্যুউনিষ্ট । মওলানা পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংক্টের কথা, দুনিয়াজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী লিপ্সার কথা শোষনের কথা বলছেন । এসময় আরেকজন মন্তব্য করলেন ' মালুম হোতা হ্যায় মলানা সিয়াসৎ সামঝতা হ্যায় ' অর্থাৎ মওলানা রাজনীতি বোঝেন । দীর্ঘ দের ঘন্টা বক্তৃতা শেষ করে মওলানা নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন । সভাস্থলে বসা সকল অতিথি একসাথে দাড়িয়ে গেল । হাতে তালি দিয়ে সমস্বরে সবাই বলে উঠলো মওলানা তো ষ্টেটসম্যান হ্যায় অর্থাৎ মওলানা একজন রাষ্ট্রনায়ক । করাচীর মেট্রোপলিটান হোটেলের অতিথিবৃন্দের সবগুলো মন্তব্যই মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল ।
 
১৯৬৭ সালে কিউবায় অনুষ্ঠিত এশিয়া, অফ্রিকা, ল্যাটিন- আমেরিকার ত্রি-মহাদেশীয় প্রগতিশীল সম্মেলনে কৃষক, শ্রমিক মেহনতী মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে এবং সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, পুজিবাদের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখার কারনে মওলানা ভাসানীর সম্মানে চেয়ারম্যান মাও সে তুং, প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই, মিশরের প্রেসিডেন্ট কর্নেল নাসের ও কিউবার গণমানুষের নেতা ফিদেল কাষ্ট্রো এক সংবর্ধনার আয়োজন করেন । এই সংবর্ধনা সভাতেই বিশ্বের সকল প্রগতিশীল নেতৃর্বৃন্দ মওলানা ভাসানীকে আফ্রো, এশিয়া, ল্যাটিন-আমেরিকার নির্যাতীত, নিপীড়িত অধিকার বন্চিত গণমানুষের নেতা হিসাবে আখ্যায়ীত করেন।
 
আজ যে বা যাহারা আফ্রো,এশিয়া,ল্যাটিন আমেরিকার নির্যাতীত কৃষক-শ্রমিক তথা গণ-মানুষের নেতা ও স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বা "রাজনীতি করবেন ক্ষমতায় যাবেন না "বলে সমালোচনা করেন তাদের কাছে আমার সবিনয়ে জিজ্ঞাসা ক্ষমতার রাজনীতি করে যারা রাষ্ট্রপতি /.প্রধানমন্ত্রী বা জাতির জনক হয়েছেন তাদের মাঝে কতজন রাষ্ট্রনায়ক বা ষ্টেটসম্যান হতে পেরেছেন ?
 
বাংলাদেশের বর্তমান তরুন প্রজন্মের অধিকাংশ মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সম্মন্ধে তেমন কিছু জানেন না । অবশ্য এই না জানার পিছনে অনেক কারন রয়েছে । এই কলামের মাধ্যমে বর্তমান তরুন প্রজন্মের কাছে মওলানা ভাসানীকে উপাস্হাপন করার জন্য এটি একটি অতি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র ।  চলবে-
এম, এ, আজিজ 
হক কথা ( The Truth ) প্রকাশনী,

আরও দেখুন

5

দেশের টানে কাছে থাকি শিরোনামে লন্ডনে অনুষ্ঠিত হলো লাখাই উপজেলা প্রবাসীদের ঈদ পূর্ণমিলনী ও আনন্দ সন্ধ্যা

ধনে ধান্যে, শিক্ষা, সাহিত্য, সাংস্কৃতি, শিল্প-বানিজ্যে সমৃদ্ধ হবিগন্জ জেলার লাখাই উপজেলা প্রবাসীদের সমন্বয়ে নবগঠিত লাখাই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *