বৃহস্পতিবার , ২ এপ্রিল ২০২০
Home » খেলাধুলা » ভারত আর বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে হাতাহাতি হলো কেন?

ভারত আর বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে হাতাহাতি হলো কেন?

ডেস্ক রিপোর্টঃ রবিবার দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে বাংলাদেশ ভারতকে হারিয়ে ট্রফি জেতার পর মাঠের ভেতরেই দুদলের ক্রিকেটারদের মধ্যে যে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে – তা নিয়ে তুমুল চর্চা হচ্ছে ক্রিকেট দুনিয়ায়।

ম্যাচের পর পরাজিত ভারতীয় অধিনায়ক প্রিয়ম গর্গ বাংলাদেশের দিকে আঙুল তুলে মন্তব্য করেছেন, “জেতা-হারাটা খেলার অংশ, এটা আমরা মেনেই নিয়েছিলাম। কিন্তু বিপক্ষ দলের কাছ থেকে আমরা কদর্য প্রতিক্রিয়া পেয়েছি।”

অন্য দিকে বিজয়ী বাংলাদেশ অধিনায়ক আকবর আলি এই ঘটনার জন্য দু:খ প্রকাশ করে বলেছেন, “ঘটনাটা সত্যিই অনভিপ্রেত ছিল।”

“আমাদের ছেলেরা আসলে খুবই পাম্পড-আপ (উত্তেজিত) ছিল, তবু যা ঘটেছে তার জন্য আমাদের দলের পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি”, বলেছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

ভারতের অনেক ক্রিকেট লেখক ও সাবেক ক্রিকেটার এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন।

ফাইনালের পর সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ ক্রাপ্টেন আকবর আলী
ফাইনালের পর সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ ক্যাপ্টেন আকবর আলী

তাদের অধিকাংশের বক্তব্যের মূল সুরটা হল, জেতার পর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের আরও সংযত আচরণ দেখানো উচিত ছিল।

তবে আগাগোড়াই ম্যাচটা যে স্লেজিং আর চড়া উত্তেজনায় মোড়া ছিল, সেটা তারাও স্বীকার করছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্রিকেট মহলের অনেকেই দাবি করছেন, ম্যাচের শুরু থেকে ভারতীয় ক্রিকেটাররা গালিগালাজ আর স্লেজিং করেই পরিবেশটা বিষিয়ে তুলেছিলেন – যার পরিণতিতেই ফাইনালের পর মাঠে ওই অপ্রীতিকর দৃশ্য দেখা গেছে।

তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের লেজেন্ড ও ওয়ান-ডে দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তাজা ফেসবুকে যুব দলকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি মন্তব্য করেছেন, “আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাও ওদের শিখতে হবে”।

ভারতের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক বিষেণ সিং বেদী আবার এই ঘটনার রেফারেন্স দিয়ে ঈষৎ ব্যঙ্গের সুরে টুইট করেছেন, ‘খেলাটার ভাবমূর্তি নষ্ট হল কি না, সেটা তো আমাদের দেখতেই হবে’।

তিনি সরাসরি কোনও একটি পক্ষকে দোষারোপ না-করলেও ভারতের অনেক ক্রিকেট সাংবাদিক ও ক্রিকেট লেখকই কিন্তু বাংলাদেশ দলের দিকে আঙুল তুলছেন।

ভারতের নামী ক্রিকেট সাংবাদিক ও এবিপি নিউজের ক্রীড়া সম্পাদক জি এস বিবেক লিখেছেন, “আগ্রাসী মনোভাব মানে যে গালিগালাজ করা বা স্লেজিং নয়, জয় উদযাপন করা মানে যে বিপক্ষের খেলোয়াড়দের শারীরিকভাবে আক্রমণ করা নয় সেটা এই বাংলাদেশ দলকে শিখতে হবে।”

তিনি আরও মন্তব্য করেছেন, “এই ক্রিকেটাররা প্রতিভাবান হতে পারে, কিন্তু মিসগাইডেড!”

ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের ক্রীড়া সম্পাদক বিক্রান্ত গুপ্তা আবার টুইট করেছেন, “বাংলাদেশ যখন উইনিং রান-টা পেল, তখনকার স্টাম্প মাইক্রোফোনের অডিও চেক করে দেখেছি কী ধরনের বাছাই করা গালিগালাজ তখন দেওয়া হচ্ছিল!”

ফাইনালের পর হতাশ ভারতীয় ক্রিকেটাররা
ফাইনালের পর হতাশ ভারতীয় ক্রিকেটাররা

তারও মূল বক্তব্য হল, বাংলাদেশ জেতার পর গালিগালাজের বাড়াবাড়ি করে ফেলাতেই পরিস্থিতি অতদূর গড়িয়েছে।

ভারতের জনপ্রিয় ক্রিকেট লেখক সমীর আল্লানাও লিখেছেন, “দারুণ একটা ম্যাচের কী লজ্জাজনক সমাপ্তি!”

বাংলাদেশ অধিনায়কের দু:খ প্রকাশের মন্তব্য টুইট করে তিনিও বোঝাতে চেয়েছেন, দোষটা আসলে বাংলাদেশের তরফেই ছিল।

অবশ্যই এই জাতীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন বাংলাদেশের ক্রিকেট কর্মকর্তা বা সমর্থকরা।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ দলের সাথে থাকা নির্বাচক হাসিবুল হোসেন শান্ত যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, “আসলে মাঠে ভারত প্রথম থেকেই গালি দিয়েছে। আমাদের খেলোয়াড়দের নানান কটুকথা বলেছে।”

“সে কারণেই জয়ের পর আমাদের ছেলেরা একটু উত্তেজিত ছিল। তারা মাঠে স্টাম্প তুলতে গেলে ঝামেলা বাধে।”

“আসলে দুদলেরই দোষ, শুধু ভারতের দোষ বলবো না। তবে ওরা আগে শুরু করেছে, আমাদের ফিজিওকেও গালি দিয়েছে। এখন আইসিসি যদি মনে করে তাহলে পানিশমেন্ট দিতে পারে।”

প্রবল উত্তাপ ছিল গ্যালারিতে দর্শকদের মাঝেও।

দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা এক প্রবাসী বাংলাদেশী, যিনি খেলা দেখতে মাঠে ছিলেন, তিনি বলছিলেন “ভারতীয় দর্শকরা যেমন চিল্লিয়েছে, তেমনি বাংলাদেশীরাও!”

পচেফস্ট্রমে খেলা দেখতে যাওয়া ওই বাংলাদেশী রায়হান রবিনের কথায়, “আমরাই ছিলাম ৮৫%। ওরা কখনো আমাদের দিকে এগিয়ে এসেছে, আবার আমরাও এগিয়ে গিয়েছি।”

জেতার পর বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের উল্লাস
জেতার পর বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের উল্লাস

“বাংলাদেশ টিমের প্লেয়ার জয় কিন্তু আমাদের কাছ থেকেই পতাকা নিয়ে মাঠের দিকে দৌড় দিয়েছিল।”

“তখন ভারতীয় প্লেয়াররা খুব উত্তেজিত ছিল। তারা তেড়ে আসছিল।”

কিন্তু মাঠে দুদলের ক্রিকেটারদের মধ্যে এতটা উত্তেজনা তৈরি হল কীভাবে?

আসলে বাংলাদেশ-ভারত ফাইনালের প্রথম ওভারের খেলা থেকেই এর সূত্রপাত।

বাংলাদেশ পেসার শরিফুলের করা প্রথম বলটিই ভারতীয় ওপেনার যশস্বী জয়সোয়াল বেশ সাবধানে খেললেন। কোনও রান হলনা, কিন্তু বোলার-ব্যাটসম্যানের চোখাচোখিটা হল দেখার মতো।

পরের বলটা ব্যাটসম্যানকে ফাঁকি দিয়ে গেল উইকেটকিপারের গ্লাভসে। এবার শরিফুল আরেকটু এগিয়ে এসে কিছু একটা বললেন জয়সোয়ালকে। স্লেজিং বেশ জমে উঠেছিল।

এর ঠিক পরের ওভারেই বাংলাদেশের তানজিম হাসান সাকিব ফিল্ডিং করে সেটা কিপারকে দিতে গিয়ে ছুঁড়ে মারলেন ভারতের আর এক ওপেনার দিব্যাংশ সাক্সেনার মাথা লক্ষ্য করে।

সাক্সেনা মাথা নিচু করে সে যাত্রা শরীর বাঁচালেও দুদলের মধ্যে উত্তাপটা টের পাওয়া যাচ্ছিল ফলে একেবারে শুরু থেকেই।

ফাইনালে ভারতের টপ স্কোরার এই যশস্বী জয়সোয়ালকে ৮৮ রানে ফিরিয়ে তাকে পকেটে পোরার ভঙ্গীতে উদযাপন করেন শরিফুল।

ভারতীয় ক্রিকেটাররাও অবশ্য সমান তালে জবাব দিয়েছে, তারা যখন ফিল্ডিংয়ে নেমেছে।

যশস্বী জয়সোয়াল ও তার কোচ জোয়ালা সিং
যশস্বী জয়সোয়াল ও তার কোচ জোয়ালা সিং

ছোট স্কোর তাড়া করতে নেমে ভারতীয় বোলিংয়ের পাশাপাশি তাদের স্লেজিংও সামলাতে হয়েছে আকবর আলী-পারভেজ ইমনদের।

আর ম্যাচ শেষে হতাশ ভারতীয়দের সামনে যখন উদযাপনে ব্যস্ত বাংলাদেশ যুব দল, সেসময় টিভি সম্প্রচারের ক্যামেরায় দেখা যায় দুদলের খেলোয়াড়দের জটলা ও ধাক্কাধাক্কি।

মাঝখানে আম্পায়ারদের দেখা যায় দুদলের ক্রিকেটারদের শান্ত করতে।

তবে মাঠে যা ঘটেছে সেটা মোটেই উচিত হয়নি বলে মনে করেন যশস্বী জয়সোয়ালের কোচ জোয়ালা সিং।

রানার আপ ট্রফি নিয়ে ভারত অধিনায়ক প্রিয়ম গর্গ
রানার আপ ট্রফি নিয়ে ভারত অধিনায়ক প্রিয়ম গর্গ

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “এটা মোটেই স্পোর্টসম্যানশিপ হলনা। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াই আমার কাছে বেশি চোখে পড়েছে।”

“দেখুন জয়-হারই তো আর সবকিছু নয়। আর মুখে কথা বলার চেয়ে ব্যাট বলেই কথা উত্তম তাদের।”

“মাত্র অনূর্ধ্ব ১৯ ক্রিকেট খেলছে তারা, তাদের শুধুমাত্র খেলাতেই মনোযোগ রাখা উচিত।”

“কারণ অনেকেই তাদের দেখছে। আমি বলব, দুদলের ক্রিকেটারদেরই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করা দরকার ছিল” – জানাচ্ছেন জোয়ালা সিং।

আরও দেখুন

Canada to stop paying Harry and Meghan’s security

Desk Report: Canada will soon stop providing security for the Duke and Duchess of Sussex, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *